পানিতেই মিশে গেল দুই বোনের প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন

 

মো: আব্দুল বাতেন বাচ্চু,

সাদিয়া আক্তার রিচি (১৪) ও রিয়া আক্তার(১০) তারা দুই বোন। তার মামা একজন প্রকৌশলী। ছোটকালেই মামাকে দেখে প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন ঝেঁকে বসে তাদের। গাজীপুরের সদর উপজেলার পানিশাইল গ্রামের সোলাইমান মিয়া ও আকলিমা আক্তার দম্পতির সন্তান বলতে এ দুজনই। এই দম্পতির ছেলে সন্তানের আক্ষেপ থাকলেও দু বোন তাদের ভালবাসা দিয়ে বাবা ও মায়ের আক্ষেপ দূর করেছিলেন। দুরন্ত মেধাবী দু’বোন লেখাপড়ায় ছিল খুবই মনোযোগী। বিদ্যালয়ে প্রতিটি শ্রেণীতে মেধা তালিকাতে তারা ছিল প্রথম অবস্থানে। তাদের নিয়ে বাবা ও মায়েরও ছিল সে কি আনন্দ। অথচ চোখের সামেনেই বাড়ীর পাশে জলাশয়ের পানিতেই আজ মিশে গেল তাদের প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন। সাথে থমকে গেছে বাবা ও মায়েরও স্বপ্ন। সন্তান হারানোর বেদনা বুকে নিয়ে এখন সামনে শুধুই ভেসে বেড়াচ্ছে তাদের স্মৃতিগুলো। যা নিয়েই হয়তো অনাগত ভবিষ্যতে তাদের কষ্টের পথ মাড়াতে হবে।

সাদিয়া আক্তার রিচি স্থানীয় হাজী জমির হাইস্কুল এন্ড কলেজের নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। আর রিয়া স্থানীয় শম্পা মডেল স্কুলের পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। গতকাল দুপুরে বান্ধবীদের সাথে বাড়ীর পাশে বয়ে যাওয়া লবলঙ্গ খালে গোসল করতে গিয়ে সাঁতার না জানায় চারজন ডুবে মারা যায়। ওই দিনই ৩ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে মঙ্গলবার বিকেল ৪টার দিকে স্থানীয়রা দমকল বিভাগের সহায়তায় পানির মধ্যে ঝোঁপের আড়াল থেকে রিয়ার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

রিয়া ও সাদিয়া আক্তার রিচি দু’বোন। এঘটনায় আকলিমা ও মায়া নামের আরো দু’কিশোরী মারা যান। তারা সকলেই প্রতিবেশী।

রিয়ার বাবা সোলাইমান মিয়া বলেন, তিনি একজন কৃষক। অভাব অনটনের সংসারে মেয়েদের নিয়েই সুখের গল্প তৈরী করতে চেয়েছিলেন। তারা বলতো, আমরা দু’বোন প্রকৌশলী হয়ে সংসারে সচ্ছলতা আনবো। তোমাদের মুখে হাসি ফুটাবো।তবে একটি দুর্ঘটনা সব শেষ করে দিল। সন্তানহীন এ জীবনে আজ অনন্ত কষ্টের বেড়াজলে পড়ে গেলাম।

সোলাইমান মিয়ার স্ত্রী আকলিমা বেগম দুই মেয়ে হারানোর পর যেন সব শেষ হয়ে গেছে। গতকাল থেকেই থমকে রয়েছেন বেশীরভাগ সময়। তার দুচোখ যেন কলিজার ধন দুজনকেই এখনো খুঁজে বেড়াচ্ছে। কিছু ক্ষন পর পর বিলাপ করে সন্তানদের স্মৃতিগুলো নিয়ে অশ্রæ ঝড়াচ্ছেন দুচোখ থেকে। প্রতিবেশী ও স্বজনদের নানা সান্তনার সামনে আজ তিনি যেন অবুঝ।
তিনি বলেন, সংসারে ছেলে না থাকায় তিনি মাঝে মধ্যে আক্ষেপ করতেন। তখন তারা বলতো আমরা লেখাপড়া করে প্রতিষ্ঠিত হয়ে তোমার ছেলের অভাব দূর করবো। তোমাদের বৃদ্ধ বয়সে আমরাই দেখে রাখবো। এ বিষয়ে তোমরা কোন চিন্তা করোনা। অনেক স্বপ্ন ছিল, ধুমধাম করে তাদের বিয়ে দেব, তাদের দিয়ে দুটি ছেলে ঘরে আনব। আজ সবই শেষ। “এখন আর কিভাবে বাঁচবো”।

বিদ্যালয়ে রিয়ার শিক্ষক রেখা আক্তার বলেন, খুবই মেধাবী শিক্ষার্থী ছিল সে। এই বয়সেই তার হাতের লেখা ছিল খুবই সুন্দর। শ্রেণীতে সে ছিল প্রথম। তাকে নিয়ে বাবা ও মায়ের সাথে আমাদেরও একটি স্বপ্ন ছিল। এমন শিক্ষার্থী নিয়ে আমাদের গর্ব হতো।

সাদিয়া আক্তার রিচির বান্ধবী ও সহপাঠি সুমাইয়া আক্তার বলেন, সে আমাদের নবম শ্রেণীতে প্রথম ছিল। বিজ্ঞান বিভাগ নিয়েছিল সে। ঘটনার দিন সকালে আমরা সবাই মিলে বিদ্যালয়ে এ্যাসাইনমেন্ট জমা দিয়ে এসেছি। পথেই বান্ধবীদের সাথে খালে গোসল করতে যাওয়ার কথা হয়। তবে আমি কিছুক্ষন পরে জানতে পারি তারা আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। পরে তাদের মৃত্যুর খবর শুনতে পাই।
গাজীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ জাকি বলেন, নিহতরা সাঁতার না জানায় এমন দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। একজন পানিতে ডুবে গেলে অন্যান্যরা তাকে বাঁচাতে যান। পরে একে একে চারজনই ডুবে যান। খবর পেয়ে ফায়ারসার্ভিসের দমকল বিভাগ চেষ্টা করে ৩জনের মরদেহ উদ্ধার করেন। পরে মঙ্গলবার বিকেলে নিখোঁজ রিয়ার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় এলাকায় শোকের মাতম বিরাজ করছে।

পাঠক মন্তব্য

     More News Of This Category এই বিভাগের আরও খবর

ফেইজবুকে আমরা

error: Content is protected !!