করোনায় যশোরের গদখালী ফুলের বাজারে শতকোটি টাকা ক্ষতির আশঙ্কা

 

মোঃ আয়ুব হোসেন পক্ষী,বেনাপোল প্রতিনিধি:

বাংলাদেশের ফুলের রাজধানী হিসাবে সুপরিচিত যশোর জেলার গদখালী বাজার। দেশের সবচেয়ে বৃহত্তম পাইকারী ফুলের বাজার এই গদখালী। আর এই কারণে গদখালী কে দেশের ফুলের রাজ্য বলা হয়ে থাকে। গদখালীতে আসা ফুলগুলো যশোর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে ঝিকরগাছা ও শার্শা থানার ৯০ টি গ্রামের প্রায় ৪ হাজার বিঘা জমিতে চাষ করা হয়।

ঝিকরগাছা ও শার্শা থানার গ্রামগুলোর রাস্তার দুইপাশে দিগন্ত বিস্তৃত জমিতে লাল, নীল, হলুদ, বেগুনি আর সাদা রঙের ফুলের সমাহার দেখে মন্ত্রমুগ্ধের মত তাকিয়ে থাকতে হয়। এছাড়া ফুলের সুগ্রান, মৌমাছির গুঞ্জন, আর রঙিন প্রজাপতির ডানায় ভর করে এখানে আসে চিরন্তন সুন্দরের বার্তা। প্রতিদিন ভোর থেকে আনাগোনা শুরু হয় এ বাজারে গদখালি-পানিসারার কয়েক হাজার ফুল চাষির। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছোট-বড় পাইকাররা সেখান থেকে ফুল কিনে নিয়ে যান। এরপর বিভিন্ন হাতবদল হয়ে পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতার মাধ্যমে ফুলের রঙ ছড়ায় নানান বয়সের নানান মানুষের মনে।

যশোর-বেনাপোল রোড ছেড়ে ডানে, বায়ের গ্রামগুলোয় ঢুকে কিছুদুর এগিয়ে গেলেই দেখা মিলবে দিগন্ত জোড়া ফুলের মাঠ। রজনীগন্ধা, গ্লাডিওল্যাস, গোলাপ আর গাঁদা ফুল চাষ হয় এসব গ্রামে। ফুল কেটে গরুর গাড়িতে করে বাজারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে থেকে বান্ডিল করে চালান হয়ে যাচ্ছে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে। প্রতিবছর ৫ থেকে ৭ কোটি স্টিক ফুল উৎপাদন হচ্ছে এসব মাঠে।

ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী ইউনিয়নের পানিসারা, হাড়িয়া, কৃষ্ণচন্দ্রপুর, পটুয়াপাড়া, সৈয়দপাড়া, মাটিকুমড়া, বাইসা, কাউরা ও ফুলিয়া গ্রামের প্রতিটি মাঠের চিত্রই এমন। শত শত বিঘা জমি নিয়ে গাঁদা, গোলাপ, গ্লাডিওলাস, রজনীগন্ধা, জারবেরা, কসমস, ডেইজি জিপসি, ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকাসহ আরো বিভিন্ন প্রজাতির ফুলের চাষ। মনে হবে সুন্দর বাংলাদেশের বুকে এক টুকরো স্বর্গ।


কিন্তু বিশ্বব্যাপী প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে ছন্দপতন র্সবত্র। তেমনি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের সবচেয়ে ফুলের যোগান দেওয়া গদখালি ফুলের চাষ ও বাজারে।

রবিবার (৫ই এপ্রিল)সরেজমিনে গদখালী ঘুরে দেখা যায়, যেখানে পূর্ব আকাশে লাল সূর্য উঁকি দেওয়ার সাথে সাথে জমে উঠতো ফুলের বাজার। সেখানেই করোনার প্রাদুর্ভাবে বাজার প্রাঙ্গণ জনমানব শূন্য। নেই আগের মতো ফুলের দাম নিয়ে তর্ক-বিতর্ক। নেই কোন হাঁকডাক। গুটি কয়েক দোকানদার বসে আছেন দোকান খুলে। ফুল চাষিরা ফুল বাগান থেকে ফুল কেটে ছাগল-গরু দিয়ে খাওয়াচ্ছেন। চাষিদের চোখে-মুখে বিষণ্নতার ছাপ!

গদখালি ফ্লাওয়ার সোসাইটি সূত্রে জানা যায়, যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালি-পানিসারার প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কৃষক ৬ হাজার হেক্টর জমিতে ফুলের আবাদ করছেন। ফুল চাষে আবহাওয়া ভালো থাকায় এবার রেকর্ড পরিমাণ ফুলের উৎপাদন হয়েছিলো। দেশের সবচেয়ে ফুলের বাজার গদখালি বাজারে প্রায় ১২ রকমের ফুল বেচা-কেনা হয়। প্রতিবছর জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ফুল চাষিদের ভরা মৌসুম। কিন্তু করোনাভাইরাসে ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস ও বাংলা বর্ষবরণ উৎসব ঘিরে ফুল চাষি ও ব্যবসায়ীদের অন্তত একশ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে দাবি গদখালি ফ্লাওয়ার সোসাইটির।

গদখালী পানিসারা এলাকার ফুল চাষি খসরু জানান, ‘আড়াই বিঘা জমিতে গোলাপ ফুলের চাষ করেছি। বাংলা বর্ষবরণ উৎসব সামনে রেখে ফুল উৎপাদনের ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিলো। কয়েক লাখ টাকা গোলাপ বাগানে বিনিয়োগ করা আছে। ঠিক সেই সময়ে করোনা ভাইরাসের দুর্যোগের কারণে ১২ দিন ধরে পরিবহন-দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। ফুলের বাজার বসছে না। ক্ষেত থেকে প্রতিদিনই দেড় হাজারের বেশি গোলাপ ফুল কেটে ছাগল গরু দিয়ে খাওয়াতে হচ্ছে। ফুল না কাটলে নতুন করে আর কুড়ি আসে না। অত্যন্ত খারাপ অবস্থার মধ্যে আছি আমরা ফুল চাষিরা।

তিনি আরো বলেন, শুধু আমার মতো না এই এলাকার হাজারো ফুলচাষি এমন বিপাকে পড়েছেন। তাদের বাগানের রজনীগন্ধা, গ্লাডিওলাস, জারবেরা ফুল কেটে গরু দিয়ে খাওয়াচ্ছে।

ঝিকরগাছার গদখালি এলাকার ফুলচাষী কৃষক জাহাঙ্গীর বলেন, তিনি এবার আড়াই বিঘা জমির গোলাপ ফুলের ক্ষেত এখন ছাগলের খাদ্যে পরিণত হয়েছে। করোনাভাইরাসের কারণে ১২ দিন ধরে ফুলের বেচাকেনা নেই। এদিকে বাগান থেকে প্রতিদিনই দেড় থেকে দুই হাজার গোলাপ কেটে ছাগল-গরুকে খাওয়াতে হচ্ছে। কারণ গোলাপ না কাটলে বাগান নষ্ট হয়ে যায়। একদিকে ফুলের বেচাকেনা নেই; অন্যদিকে ফুল কাটার জন্যে শ্রমিক খরচ গুনতে হচ্ছে। প্রতিদিনই শাহজাহানের দুই হাজার টাকা লোকশান গুনতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির সভাপতি আব্দুর রহিম বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে গদখালির পাইকারি ফুলের বাজার ২৪ এপ্রিল থেকে বন্ধ রয়েছে। চাষিরা ফুল বিক্রি পারছেন না। আবার ক্ষেতে ফুল রাখতেও পারছে না। এরকম উভয় সংকটে পড়েছেন তারা। এর মধেই ১০০ কোটি টাকার মতো ক্ষতি হয়েছে। এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কৃষককে খাদ্য সরবারাহ ও বিনা সুদে সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রী ও সচিব মহোদয়ের কাছে একটি স্মারকলিপি দিয়েছি।

যশোরের জেলা প্রশাসক ও ঝিকরগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে এ বিষয়টি মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে।

     More News Of This Category এই বিভাগের আরও খবর

ফেইজবুকে আমরা

Archive Calendar

error: Content is protected !!