যৌন উত্তেজক ‘মিসাইল’ ‘একে ৪৭’ কিনতে কিশোর-যুবকের সাথে ছুটছেন বৃদ্ধরাও!

►সাজাপ্রাপ্ত ওষুধ প্রতিষ্ঠানের মালিক তৈরি করছেন নিষিদ্ধ সব ওষুধ ►ইউনানী উপাদানে প্রস্তুত বলা হলেও ব্যবহৃত হয় মারাত্মক রাসায়নিক উপাদান ►ব্যবহারকারীদের বড় ধরনের স্বাস্থ্যক্ষতির আশঙ্কা ►পান ও মুদি দোকানেও অবাধে মিলছে ওষুধটি.

গাজীপুরে অবাধে বিক্রি হচ্ছে ‘মিসাইল’ কিংবা ‘একে ৪৭’। এগুলো বিধ্বংসী অস্ত্র নয়, যৌন উত্তেজক ওষুধ। অস্ত্র নয় বলে যে ভয়ের নেই সে চিন্তা করা ভুল। কারণ, এই ওষুধ যে ব্যবহারকারীদের বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। বিশেষ নামের এই ওষুধটিকে বিক্রেতা ও ক্রেতারাই মিসাইল, ম্যাজিক বুলেট বা কেউ একে ৪৭ নামে ডাকছেন। বিপণনকারী বা বিক্রেতাদের মুখের কথায় হোক বা বিজ্ঞাপন, ক্রেতাদের ধারণা জন্মেছে যে, যৌন উত্তেজক ওষুধটির কার্যকারিতা এসব অস্ত্রের মতোই অব্যর্থ। তাই গাজীপুরে চাহিদা তার আকাশচুম্বি। সন্ধ্যা নামলেই কিশোর, যুবক এমনকি বৃদ্ধরাও ওষুধের দোকানে ছোটেন এসব কিনতে। আবার অনেক পান ও মুদি দোকানেও অবাধে মিলছে ‘যাদুকরী’ এ ওষুধ।

ইউনানী উপাদানে তৈরি বলা হলেও বিষেশজ্ঞরা বলছেন, এই ক্যাপসুলে রয়েছে রাসায়নিক উপাদান ‘সিলডেনাফিল সাইট্রেট’। যা মানুষের শরীরের জন্য ভয়ংকর ক্ষতিকর। অভিযোগ উঠেছে ড্রাগ প্রশানের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজসে রমরমা ব্যবসা করছে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান জিকে ফার্মা। গাজীপুর জেলা ওষুধ প্রশাসনের দপ্তর থেকে জিকে ফার্মার দূরত্ব দেড় কিলোমিটারেরও কম।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, যৌন উত্তেজক ওষুধটির নাম ‘হলি মুনিশ’। এই ক্যাপসুল বাজারে ছেড়েছে গাজীপুরের টঙ্গীর ৪৯ স্টেশন রোডের জিকে ফার্মা (ইউনানী) লিমিটেড। ২০১৬ সালের জুন মাসে ওষুধ অধিদপ্তর থেকে উৎপাদন লাইসেন্স পায় জিকে ফার্মা। প্রতিষ্ঠানটির মালিক নিষিদ্ধ হওয়া হলি ড্রাগসের মো. গিয়াস উদ্দিন। ২০টি ওষুধের অনুমোদন থাকলেও জিকে ফার্মা অবৈধভাবে আরো ৫০টি মিলিয়ে উৎপাদন করছে ৭০টিরও বেশি ওষুধ। তার মধ্যে হলি মুনিশ, হলি নিশাত, মোলাডেক্স, কোর হেল্থ, এরিকোমা, এরক্সিমা ও জয়সু ইত্যাদি যৌন উদ্দিপক। তবে সারাদেশ ও গাজীপুরে বিক্রির শীর্ষে রয়েছে ‘হলি মুনিশ’।

চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া বিক্রির নিয়ম না থাকলেও এ ওষুষ অবাধে বিক্রি হচ্ছে। ব্যবহারকারীদের জানানো হয়েছে, সেবনের কয়েক মিনিটেই কাজ শুরু হয় এবং দীর্ঘসময় যৌনমিলন সম্ভব। তাই কিশোর থেকে শুরু করে যুবক ও বৃদ্ধদের কাছে ব্যাপক কদর এর। এছাড়াও জিকে ফার্মার কফ সিরাপ আরুশা, এ্যাজভেন্ট, এপটোরেক্স, হলি তুসীতে রয়েছে অ্যালকোহল। এসব সিরাপ ফেন্সিডিলের বিকল্প হিসেবে মাদকসেবীর কাছে জনপ্রিয়। এসব বিক্রি করে মাত্র তিন বছরের মধ্যে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে জিকে ফার্মা।

কী আছে হলি সেই মিসাইল-একে ৪৭-এ
ওষুধটির জেনেরিক নাম ‘কুরছ মুবাহ্হী’। ওষুধের প্যাকেটে ৫০০ মিলিগ্রামের ক্যাপসুলে শোধিত শিলাজতু, আলকুশী বীজ, ছা’লাব, লাল বামন, মোট বচ, পিপুল, শুঁঠে, অশ্বগন্ধা, জাফরান, আম্বর আশ্হাবসহ ১৬টি ইউনানী উপাদান রয়েছে উল্লেখ করা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছক জিকে ফার্মার একজন সাবেক হাকিম বলেন, যেসব ইউনানী উপাদানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তার একটিও নেই হলি মুনিশে। অপিয়াম (অপিয়েট) নামে এক ধরনের মাদক এবং সিলডেনাফিল সাইট্রেট নামের রাসায়নিক দ্রব্য দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে হলি মুনিশ। কারখানায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এক তোলা ইউনানী জৈব কাঁচামাল কেনা হয়নি। নেই ল্যাব, কেমিস্ট, মাননিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা, দক্ষ হাকিম বা কবিরাজ। টঙ্গীর ৪৯ স্টেশনের রোডের বাড়িটির ভেতরে জিকে ফার্মার ছোট একটি সাইনবোর্ড থাকলেও মানুষ কারখানাটিকে চিনে ‘হলি ড্রাগস’ নামে। মূলত ওষুধ প্রশাসনের কতিপয় কর্মকর্তার যোগসাজসে ক্ষতিকারক উত্তেজক ওষুধ তৈরি করে বিক্রি করছে প্রতিষ্ঠানটি।

দুই বছরের সাজাপ্রাপ্ত গিয়াস উদ্দিন
জিকে ফার্মার আগে মো. গিয়াস উদ্দিন ছিলেন হলি ড্রাগসের মালিক। হলি ড্রাগসের কারখানা ছিল টঙ্গীর ৪৯ স্টেশন রোডের বর্তমান জিকে ফার্মার বাড়িটি। ইউনানী ওষুধ তৈরির লাইসেন্স নিয়ে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকারক বিভিন্ন যৌন উত্তেজক ওষুধ তৈরির অভিযোগে ২০১২ সালের  ৯ মে ওষুধ অধিদপ্তর হলি ড্রাগসের লাইসেন্স বাতিল করে সব ধরনের ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত বন্ধের নির্দেশ দেয়। তারপরও গোপনে চলে আসছিল উৎপাদন বাজারজাত করে আসছিল ‘হলি ড্রাগস’। ওই বছরের ১০ সেপ্টেম্বর রাজধানী বনানী এফ ব্লকের পাঁচ নম্বর সড়কের ১১ নম্বর বাড়িতে অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। উদ্ধার হয় হলি ড্রাগসের ১০ লাখ টাকা মূল্যের ৩৭ ধরনের ওষুধ। এ ঘটনায় ভুয়া লাইসেন্স ব্যবহার করে ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত করার অপরাধে হলি ড্রাগসের মালিক গিয়াস উদ্দিনকে (৫৮) দুই বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

পরে মুক্তি পেলেও ভেজাল ওষুধ তৈরির নেশা ছাড়তে পারেননি গিয়াস উদ্দিন। ২০১৬ সালের ২৯ মে বরিশাল শহরে একটি বাড়ি থেকে পুলিশ উদ্ধার করে নিষিদ্ধ হলি ড্রাগসের ১৫ লাখ টাকা মূল্যের ওষুধ যার বেশিরভাগই ছিল হলি মুনিশসহ উত্তেজক ওষুধ।

২০১৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মহাখালী ও টঙ্গী এলাকার পিনাকল সোর্সিং লিমিটেড, হলি ড্রাগস ল্যাবরেটরিজ, হলি ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেড ও জিকে ফার্মায় অভিযান চালিয়ে র‍্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত অবৈধভাবে উৎপাদিত ৫ কোটি ১৬ লাখ টাকার ওষুধ জব্দ করে। পিনাকল সোর্সিংয়ের মাধ্যমে এসব ওষুধ পাইকারি ও খুচরা বাজারে বিক্রি করা করছিল। ৪টি প্রতিষ্ঠানেরই মালিক ছিলেন মো. গিয়াস উদ্দিন। পরে সিলগালা করা হয় কারখানা। বহু চেষ্টা করেও তিনি হলি ড্রাগসের লাইন্সেস ফেরত না পেয়ে গঠন করেন জিকে ফার্মা। ২০১৬ সালের ২৬ জুন ওষুধ প্রশাসন থেকে লাইসেন্স পায় জিকে ফার্মা (ইউনানী) লিমিটেড। নিয়ম ভেঙে নিষিদ্ধ হলি ড্রাগসের ‘হলি মুনিশ’সহ সব ওষুধ ওই নামেই উৎপাদনের অনুমোদনও পায় জিকে ফার্মা। ওষুধ প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা বলেন, এটি রীতিমত চাঞ্চল্যকর। কোনো নিষিদ্ধ ওষুধ একই নামে নতুন কোনো কোম্পানিকে দেয়ার নিয়ম নেই। এটি অপরাধও।

গাজীপুর জেলা ওষুধ প্রশাসনের সহকারী উপ-পরিচালক মো, আক্তার হোসেন জানান, জিকে ফার্মার ওষুধে ইউনানী উপাদান নেই, এটি তার জানা নেই। প্রতিষ্ঠানটি কয় ধরনের ওষুধ উৎপাদনের অনুমতি আছে, কয়টি উৎপাদন করছেন তাও জানেন না। অভিযোগ থাকলে তদন্ত করে দেখা হবে।

বক্তব্য জানতে কারখানায় গেলে নিরাপত্তা প্রহরি মো. ইমান আলী জানান, স্যারদের কেউ কারখানায় নেই। তাদের অনুমতি ছাড়া ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া যাবে না। কারখানার উৎপাদন কর্মকর্তা মো. আজহারুল ইসলামের মোবাইলে একাধিকবার ফোন দেয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

জিকে ফার্মার অনিয়মের প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ওষুধ প্রশাসনের লাইসেন্স শাখার সহকারী পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম জানান, বিষয়েটি দেখভাল জেলা ওষুধ  প্রশাসনের। তাই এ বিষয়ে ওই অফিসে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।

মন্তব্য

     More News Of This Category এই বিভাগের আরও খবর

ফেইজবুকে আমরা

Archive Calendar

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০৩১  
error: Content is protected !!